দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্মণধর্মে দীক্ষিত । উপনিষদের সুমহান আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন । তাঁর স্ত্রী সারদা দেবী ছিলেন পনেরােটি সন্তানের জননী । রবীন্দ্রনাথ তার চতুর্দশ সন্তান । তাঁর জন্ম হয় ঠাকুর বাড়িতে ২৫ শে বৈশাখ , ১২৬৮ বঙ্গাব্দ । ঠাকুর বাড়ি ছিল সেই যুগে সাহিত্য , সংস্কৃতি , শিল্পকলা , সংগীতের পীঠস্থান । দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ , মধ্যম সত্যেন্দ্রনাথ , পরবর্তী সন্তান হেমেন্দ্রনাথ , জ্যোতিন্দ্রনাথ , সকলেই ছিলেন প্রতিভাবনা। রবীন্দ্রনাথের জীবনে এই চার ভাইয়ের প্রভাব পড়েছিল খুব বেশি । শিশু রবীন্দ্রনাথের জীবন কেটেছিল নিতান্তই সরল সাদাসিদে ভাবে ঝি-চাকরদের হেফাজতে । একটু বড় হতেই প্রথমে ভর্তি হলেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে । অল্প কিছুদিন পর সেখান থেকে গেলেন নর্মাল স্কুলে । বাড়িতে ছেলেদের সর্ববিদ্যা পারদর্শী করার জন্য বিচিত্র শিক্ষার আয়ােজন করা হয়েছিল । ভােরবেলায় পালােয়ানের কাছে কুস্তি শেখা , তারপর গৃহশিক্ষকের কাছে বাংলা , অঙ্ক , ভূগােল , ইতিহাস পড়া । তারপর স্কুল ছুটির পর ইংরেজি পড়া , ছবি আঁকা , জিমনাস্টিক , রবিবার সকালে বিজ্ঞান পড়া ইত্যাদি। রুটিন বাধা জীবনে শিশু মন হাঁপিয়ে ওঠে । এগারাে বছর বয়েসে প্রথম মুক্তির স্বাদ পেলেন রবীন্দ্রনাথ । পিতা দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে গেলেন ১৮৭৩ সালে । বােলপুর তখন নিতান্তই এক গ্রাম । সেই প্রথম প্রকৃতির সাথে পরিচয় হল । এখানেই বালক কবির  কাব্য রচনার সূত্রপাত ঘটে । বােলপুর থেকে হিমালয় চার মাস পশ্চিমের ভ্রমণ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথ । স্কুল ভাল লাগে না । বাড়িতেই শিক্ষা শুরু  হল পড়াশুনা আর কবিতা লেখা । তেরাে বৎসর আট মাস বয়েসে অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রথম শিরোনামে কবিতা ছাপা হল , “ হিন্দুমেলার উপহার " । ১২৮৪ সালে দ্বিজেন্দ্রনাথের সম্পাদনায় ভারতী পত্রিকা বের হল । নিয়মিত লিখে চলেন রবীন্দ্রনাথ । ষােল বছর বয়েসে লিখলেন "ভানুসিংহের পদাবলী" । ধীরে ধীরে কৈশাের উত্তীর্ণ হন রবীন্দ্রনাথের  । অভিভাবকদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও স্কুলের গণ্ডি উত্তীর্ণ করতে পারলেন না । স্থির হল বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টার হবেন । মেজভাই সত্যেন্দ্রনাথের সাথে রওনা দিলেন  বিলাতের পথে । লন্ডনে গিয়ে প্রথমে পাবলিক স্কুলে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন । কিন্তু পড়াশুনায় মন নেই , বেশির ভাগ সময় কাটে সাহিত্য চর্চা আর নাচে গানে । দেড় বছর বিলেতে কাটালেন । যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন তার কিছুই হল না । দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে দেশে ফিরে এলেন । তখন তিনি উনিশ বছরের এক তরুণ যুবক । কবির মন তখন নতুন কিছু সৃষ্টির জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে । লিখলেন গীতিনাট্য “ বালীকি প্রতিভা " -কবি প্রতিভার শ্রম সার্থক প্রয়াস যা আজও সমান জনপ্রিয় । তরুণ কবির হাতে ঝর্ণাধারার মত কবিতা রচিত হতে থাকে । প্রকাশিত হল ভগ্নহৃদয় রুদ্রচণ্ড । কবি প্রতিভার পূর্ণ প্রকাশ না ঘটলেও সেই সময় এই কাব্য দুটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল । রবীন্দ্রনাথের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও ভাবি কাদম্বী দেবী তখন ছিলেন চন্দননগরে । কবি গেলেন তাদের কাছে , বাড়ি পাশেই গঙ্গা । এখানে বসেই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন “ বৌঠাকুরাণীর হাট ” তাঁর প্রথম উপন্যাস , প্রতাপদিত্যের জীবন অবলম্বনে এর কাহিনী গড়ে উঠেছে । বৌঠাকুরাণীর হাট ধারাবাহিকভাবে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ( ১৮৮৩ ) । চন্দননগর থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এসে বাসা বাঁধলেন সদর স্ট্রীটের বাসা বাড়িতে । এখানে কবির জীবনে ঘটল এক নতুন উপলব্ধি । এই অপূর্ব অনুভূতির মধ্যে দিয়েই জন্ম হল কবির অন্তস্তি কাব্যসত্তার । সেই দিনই কবি লিখলেন তার বিখ্যাত কবিতা "নিঝরের স্বপ্নভঙ্গ "। ১৮৮৩ , ৯ ডিসেম্বর , রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হল ঠাকুর বাড়িরই এক কর্মচারীর কন্যার সাথে,  বারাে বছর বয়স তার  । বিয়ের আগে নাম ছিল ভবতারিণী এবং বিয়ের পর নতুন নাম হল মৃণালিনী । ঠাকুরবাড়ি শুধু যে বাংলার সংস্কৃতির জগতের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল তাই নয় , আর্থিক দিক থেকেও ছিল অন্যতম ধনী । পূর্ববঙ্গ উত্তরবঙ্গে ছিল বিস্তৃত জমিদারি । সব ভার এসে পড়ল রবীন্দ্রনাথের উপর । বাংলার গ্রামে - গঞ্জে নদীপথে ঘুরতে ঘুরতে রবীন্দ্রনাথ যে বিপুল অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তা তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল । বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতাগুলি নিয়ে প্রকাশিত হল মানসী ( ১৮৯০ ) । এতে কবি প্রতিভার শুধু যে পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে তাই নয় , বাংলা কাব্য জগতেও এ এক নতুন সংযােজন । বন্ধু শ্ৰীশচীন্দ্র প্রকাশ করলেন নতুন একটি পত্রিকা হিতবাদী ।  রবীন্দ্রনাথ হলেন এর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক । সেই সময় জমিদারির কাজে নিয়মিত যেতে হল শিলাইদহে । সেখানে ঘুরে বেড়ান গ্রামে গ্রামে । সেখানকার মানুষের ছােট ছােট সুখ দুঃখের আলােয় জন্ম দিতে থাকে একের পর এক ছােট গল্প - দেনা-পাওনা , গিন্নি , পােস্টমাস্টার , ব্যবধান রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা , প্রতিটি গল্প প্রকাশিত হয় হিতবাদীতে । কিন্তু কয়েক মাস পরেই হিতবাদীর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল আর ভ্রাতুস্পুত্রেরা একটি পত্রিকা বের করল , ' সাধনা ' । রবীন্দ্রনাথের গল্পের জোয়ার বইতে সুরু হল । প্রথম গল্প বার কুল খোকা , কাকুর -৪ হ্যাবর্তন , তারপর সম্পত্রি সমর্পণ , কঙ্কাল , জীবিত ও মৃত্ত , স্বর্ণমগ, জয়-পরাজয় ,দালিয়া । প্রতিটি গল্পই বিয়ােগান্ত । নিজের দেশ ও দেশবাসীর প্রতি ছিল তার গভীর শ্রদ্ধর ভয়তে ইংরেজ শাসনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে লিখেছিলেন বেশ কিছু প্রবন্ধ , “ ইংরেজ ও ভারতবাসী " , " “ ইংরেজের আতঙ্ক " , সুবিচারের অধিকার , “ রাজা ও প্রজা ” । কবিতা আর গানের পাশাপাশি লিখতে থাকেন একের পর কাব্য নাটক । বহুদিন পূর্বে লিখেছিলেন প্রকিতির পরিশোধ , চিত্রাঙ্গদা , বিদায় , অভিশাপ , মালিনী । এবার লিখলেন গান্ধারীর আবেদন , সতী , নরকবাস , লক্ষ্মীর পরীক্ষা । কবিতা সম্রাট  গানের জগতে থাকতে মন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল । লিখলেন হাস্যরসাত্মক রচনা চিরকুমার সভা  ১৩০৮ ( ইং ১৯০১ ) নতুন করে বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হল । রবীন্দ্রনাথ হলেন তার সম্পাদক । প্রবন্ধবতার সাথে প্রকাশিত হল নতুন উপন্যাস চোখের বালি । শিলাইদহে বহুদিন ছিলেন সপরিবারে । এলেন শান্তিনিকেতনে । এখানে প্রতিষ্ঠা করলেন আবাসিক বিদ্যালয় । স্ত্রী মৃণালিনী দেবী অসুস্থ হয়ে পড়লেন ,কলকাতায় নিয়ে আসা হয় । অল্পদিনের মধ্যেই তার মৃত্যু হল । তখন মুনালিণী দেবীর বয়স ছিল ত্রিশ , রবীন্দ্রনাথের একচল্লিশ । তাঁদের তিন কন্যা মাধুরীলতা , রেণুকা , মীরা , দুই পুত্র রবীন্দ্রনাথ আর মনীন্দ্র । তখন রেণুকার বয়স মাত্র তেরাে । মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর অল্পদিন পরই কন্যা রেণুকা অসুস্থ হয়ে পড়ল । কবির আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও বাঁচানাে গেল না  । ইন্ডিয়া সােসাইটি থেকে প্রকাশিত হল গীতাঞ্জলি । ইংল্যান্ডের শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল । কাগজে কাগজে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা । কবি আমেরিকা হয়ে ফিরে এলেন কলকাতায় । সেখানকার পরিবেশ ভাল লাগে না । ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে । ১৫ ই নভেম্বর ১৯১৩ সন্ধ্যাবেলায় সংবাদ এল কবি  সাহিত্যের জন্য নােবেল পুরস্কার পেয়েছেন । তিনিই প্রথম প্রাচীনবাসী যিনি এই পুরস্কার পেলেন । সবুজ পত্রে একের পর এক প্রকাশিত হল ছোট গল্প । এদের মধ্যে বিখ্যাত হৈমন্তী , বােষ্টমী , স্ত্রীর পত্র । ১৩২২ সাল রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্র লিখতে আরম্ভ করলেন , ' ঘরে বাইরে ” । ১৯১১ - এর ১৩ ই এপ্রিল ইংরেজ সৈন্যরা জালিয়ানওয়ালাবাগ ৩৭৯ জনকে নিশংসভাবে হত্যা করল । তীব্র ঘৃণায় রবীন্দ্রনাথের সমস্ত অন্তর ভরে উঠল । তিনি বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ভকে লেখা এক খােলা চিঠিতে সরকার প্রদত্ত নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করবার কথা ঘােষণা করলেন । প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছেন কবি । পরিণতির সাথে সাথে রচনায় ফুটে ওঠে পরিবর্তনের ছোঁওয়া । লিখলেন রক্তকরবী , চণ্ডালিকা । রাশিয়ায় গিয়ে ভাল লেগেছিল কবির সেখানকার মানুষ কর্মপ্রচেষ্টা । নতুন দেশ গড়ার উদ্যত কবিকে মুগ্ধ করেছিল । তিনি লিখলেন ' রাশিয়ার চিঠি ' । বৃদ্ধ বয়সে এসে কবি ডুবে থাকেন গান আর ছবি আঁকায় । আবার তারই ফাকে ফাকে লিখলেন শ্যামলী , প্রান্তিক , সেঁজুতি , আকাশ প্রদীপ , ছড়ার উৎসব , নৃত্যনাট্য শ্যামা । কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন উৎসবে ভাষণ দেবার জন্য কবির ডাক এল । তিনিই প্রথম বেসরকারী ব্যক্তি যিনি এই সম্মান পেলেন । চিরাচরিত প্রথা ভেঙে কবি বাংলায় বক্তৃতা দিলেন । ১৯০৪ সালের ৭ ই আগস্ট অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে শান্তিনিকেতনে কবিকে ডক্টর উপাধি দেওয়া হল । ইংরেজরা দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত সম্মান জানাল কবিকে । কবির স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে । সেই আগের মত সচল নয় । তবুও তারই মধ্যে লিখলেন তাঁর বিখ্যাত গল্প "ল্যাবরেটরি বদনাম" । বিছানায় শুয়ে শুয়ে বলে যান অন্যে লিখে নেয় । এই সময়ে লেখা কবিতাগুলি সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হল ‘ রােগশয্যায় ' । কবি শান্তিনিকেতনে ছিলেন । চিকিৎসা জন্য কলকাতা নিয়ে আসা হল । জোড়াসাঁকোর বাড়িতে কবির অপারেশন করা হল । তার কিছুক্ষণ আগে লিখেছেন জীবনের শেষ কবিতা । 


          তােমার সৃষ্টির পথ রেখেছে আকীর্ণ করে

            বিচিত্র ছলনা জালে হে ছলনাময়ী ।।

                          * * * * * * *

                        * * * * * * * * *  

      শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে আপন ভাণ্ডারে 

              অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে 

                সে পায় তােমার হাতে শান্তি অক্ষয়

                                   অধিকার 


অপারেশনের পর কবি জ্ঞান হারালেন । সে জ্ঞান আর ফিরল না । রাখী পূর্ণিমার দিন দুপুর বেলায় । ৩৪৮ সালের ২২ শে শ্রাবণ ( ইং ১৯৪১ সালের ৭ ই আগস্ট ) একটি মহাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল ।